সন্তানদের ওপর ভরসা নেই, জীবিত থাকতেই নিজের কবর প্রস্তুত করলেন বৃদ্ধা

ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের ৭০ বছর বয়সী আয়েশা বেগম জীবিত অবস্থাতেই নিজের কবর প্রস্তুত করে রেখেছেন। মৃত্যুর পর সন্তানরা দাফনের দায়িত্ব নেবে না—এমন আশঙ্কা থেকেই ঘরের পাশেই নিজের শেষ আশ্রয় তৈরি করেছেন তিনি।
আয়েশা বেগম ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজের তৈরি কবরটির পাশ দিয়েই হাঁটেন। কখনো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন, যেন আগেভাগেই দেখে নেন নিজের শেষ ঠিকানা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বামীর মৃত্যুর পর তিন ছেলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর আর মায়ের খোঁজখবর নেন না। কিছুদিন ছেলেদের সঙ্গে থাকলেও বনিবনা না হওয়ায় তিনি চলে আসেন। পরে স্বামীর দেওয়া জমিতে একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একাই বসবাস শুরু করেন।
তার বসবাসের ঘরটিও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। টিনের চাল ফুটো হওয়ায় বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, নেই বিদ্যুৎ-সংযোগ। অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাকে। প্রতিবেশীদের সহায়তাই এখন তার প্রধান ভরসা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা বেগম বলেন, “অনেক কষ্ট করে ছেলেদের মানুষ করেছি। এখন কেউ একবারও এসে জিজ্ঞেস করে না, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ ঘরে পানি পড়ে, অন্ধকারে থাকি। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। আমার মৃত্যুর পর কী হবে, সেই চিন্তা থেকেই নিজের কবর বানিয়ে রেখেছি।”
তিনি আরও বলেন, “পাঁচ বছর ধরে একা থাকি। বর্ষায় বাড়ির আঙিনায় হাঁটুসমান পানি জমে। অনেক দিন মাছ-গোশত খাইনি। এখন প্রতিদিন মৃত্যুর দিন গুনছি। এলাকাবাসীকে বলে রেখেছি, আমি মারা গেলে যেন তারাই আমাকে এই কবরেই দাফন করেন। আমার সন্তানের ওপর কোনো ভরসা নেই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ বছর ধরে একাই বসবাস করছেন আয়েশা বেগম। এলাকার মানুষই মাঝে মধ্যে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন। মৃত্যুর পর তাকে যেন আগে থেকে প্রস্তুত করা ওই কবরেই দাফন করা হয়—এ কথাও তিনি প্রতিবেশীদের জানিয়ে রেখেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পী বলেন, “চাচি প্রায়ই বলেন, মারা গেলে তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয়। তার ছেলেরা সবাই ব্যবসা করেন, আর্থিক অবস্থাও ভালো। কিন্তু কেউ মায়ের খোঁজ নেন না। আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলেও উল্টো আমাদের সঙ্গেই খারাপ আচরণ করা হয়।”
এ বিষয়ে আয়েশা বেগমের দুই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।