সর্বশেষ
গাজীপুরের সেই ইমামের অপহৃত মেয়ে উদ্ধার, প্রেম ও কোর্ট ম‍্যারেজের গুঞ্জন।জনরোষে পদত্যাগ শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী ও সচিবের।আড়াল থেকে সহযোদ্ধাদের প্রতি মেজর জিয়াউল হকের আহ্বান।আজ ১৮ এপ্রিল: বড়াইবাড়ি দিবস—সীমান্তে বিডিআরের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক গৌরবগাঁথা।মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ভাবনা।বিশ্বকাপ ২০২৬-এর টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনার জবাব দিলেন ইনফান্তিনোত্রিপুরা পার্বত্য পরিষদের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় আদিবাসী দল টিপরা মোথারইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্যে মুনাফা করল কারাগাজীপুরের সেই ইমামের অপহৃত মেয়ে উদ্ধার, প্রেম ও কোর্ট ম‍্যারেজের গুঞ্জন।জনরোষে পদত্যাগ শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী ও সচিবের।আড়াল থেকে সহযোদ্ধাদের প্রতি মেজর জিয়াউল হকের আহ্বান।আজ ১৮ এপ্রিল: বড়াইবাড়ি দিবস—সীমান্তে বিডিআরের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক গৌরবগাঁথা।মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ভাবনা।বিশ্বকাপ ২০২৬-এর টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনার জবাব দিলেন ইনফান্তিনোত্রিপুরা পার্বত্য পরিষদের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় আদিবাসী দল টিপরা মোথারইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্যে মুনাফা করল কারা
Live Bangla Logo

আজ ১৮ এপ্রিল: বড়াইবাড়ি দিবস—সীমান্তে বিডিআরের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক গৌরবগাঁথা।

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
আজ ১৮ এপ্রিল: বড়াইবাড়ি দিবস—সীমান্তে বিডিআরের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক গৌরবগাঁথা।


আজ ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস। ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি সীমান্তে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বাংলাদেশ রাইফেলস (তৎকালীন বিডিআর, বর্তমান বিজিবি) এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রতিরোধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে এক বিরল বিজয়ের ইতিহাস।


সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট

১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে বিএসএফ বড়াইবাড়ি সীমান্তে অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে।


১৮ এপ্রিলের ঘটনা

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোরে বিএসএফ সদস্যরা রাত ৩টার দিকে ভারতীয় কমান্ডো ব্ল্যাক ক্যাটস ও বিএসএফ-এর প্রায় ৪০০ সদস্যের যৌথ-বাহিনী বাংলাদেশের বড়াইবাড়ি ক্যাম্প দ'খল করতে আসে।


১৮ এপ্রিল ভোররাতে বড়াইবাড়ি গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা তাদের কৃষিজমিতে সেচের কাজ দেখতে যান। এ সময় তারা দেখতে পান, ধানক্ষেতে বহু সশস্ত্র সৈন্য চলাফেরা করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রামবাসীদের কাছে হিন্দি ভাষায় জানতে চান-বিডিআরের ক্যাম্প কোথায়। তখনই গ্রামবাসীরা বুঝতে পারেন, তারা ভারতের বিএসএফের সদস্য।


বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে বিএসএফ ঢুকে পড়ার খবর দ্রুত বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে পৌঁছে দেন একজন কৃষক। তিনি যখন বিডিআর ক্যাম্পে পৌঁছান, তখন সেখানে মাত্র আটজন বিডিআর সদস্য উপস্থিত ছিলেন।


তিনি বলেন,“ক্যাম্পে গিয়ে আমি বিডিআর সদস্যদের জানাই যে বিএসএফ আমাদের এলাকায় ঢুকে পড়েছে। তারা সঙ্গে সঙ্গে অ'স্ত্র নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। 


কিছুক্ষণ পর প্রস্রাবের জন্য বাইরে বের হয়ে পুকুরের ওপার পাড়ে বিএসএফ সদস্যদের দেখতে পাই। দৌড়ে ক্যাম্পে ফিরে এসে খবর দিতেই সঙ্গে সঙ্গে গো'লা'গু'লি শুরু হয়। চারদিক থেকে শত শত গু'লি ছোড়া হচ্ছিল। আমিও তখন অ'স্ত্র তুলে নিই।”


প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া তীব্র গো'লাগু'লির শব্দে প্রক'ম্পিত হয়ে ওঠে বড়াইবাড়ি গ্রাম ও আশপাশের এলাকা। 


প্রচণ্ড সংঘ'র্ষে আত'ঙ্কিত গ্রামবাসীরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।


ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিএসএফরা বড়াইবাড়ী বিডিআর ক্যাম্প দখ'ল করার জন্য পূর্বদিক থেকে গু'লীব'র্ষণ শুরু করে। বিএসএফ গু'লীব'র্ষণ করলেও বিডিআর ১০ মিনিট এই গু'লির জবাবে কোন প্রকার পাল্টা গু'লি না করে চুপচাপ থাকে। 


বিডিআর চুপচাপ থাকায় ভারতীয় বাহিনী মনে করেছিল বিডিআররা হয়তো বিএসএফের ভয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়েছে। এই ধারনা করেই ভারতীয় বাহিনী পশ্চিম দিক থেকে অসতর্কভাবে বিডিআর ক্যাম্পের দিকে এগুতে থাকলে বড়াইবাড়ী বিওপির চারটি মেশিনগান একসাথে গর্জে উঠে। মিনিটে সাতশ গু'লী ছুঁড়তে পারা মেশিনগান থেকে অকস্মাৎ ব্রা'স ফা'য়ারের গু'লি খেয়ে ভারতীয় বাহিনী হকচকিয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালাতে থাকে। 


বিডিআরের মেশিনগানের গু'লিতে অনেক হতা'হত হয়। দুর্ধ'র্ষ কমান্ডো ক্যাটস আইসহ বিএসএফ-এর ১৬জন সৈনিকের লা'শ বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে থাকে। কয়েকজন সেনাকে গ্রামের জনগণ ধরে গাছের সাথে বেঁ'ধেও রাখে। ভারত যদিও এতো হতা'হতের কথা স্বীকার করে নাই তবে অনেকের ধারনা এই যু'দ্ধে ভারতের প্রায় ৭০জন সৈন্য নি'হত হয়েছিল।


বড়াইবাড়িতে সংঘ'র্ষ চলাকালে ঢাকায় তৎকালীন বিডিআর সদরদপ্তরের নির্দেশে জামালপুর ও ময়মনসিংহ থেকে অতিরিক্ত বিডিআর সদস্য পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে দশটার দিকে ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকে আসা বিডিআর সদস্যরা বড়াইবাড়িতে পৌঁছান। ১৮ এপ্রিল ভোর পাঁচটা থেকে সকাল এগারোটা পর্যন্ত একটানা গো'লাগু'লি চলে।


চার ঘণ্টা পর্যন্ত ওই ৮ জন সদস্য একাই প্রতিরোধ চালান। পরে আরও দুটি ক্যাম্প থেকে ২০ জন বিডিআর সদস্য এসে যোগ দেন। গ্রামের আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরাও বিডিআরের পাশে দাঁড়ান। সম্মিলিত প্রতিরোধে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়।


এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। এভাবে ১৮ এপ্রিল সারাদিন এবং রাত পেরিয়ে ১৯ এপ্রিল রাত পর্যন্ত থেমে থেমে গো'লাগু'লি অব্যাহত থাকে। বড়াইবাড়ি সংঘ'র্ষে বিএসএফের ১৬ জন সদস্যের মৃ'তদেহ বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে পাওয়া যায়।


সংঘ'র্ষের পর ২০ এপ্রিল বিএসএফ-এর ম'রদেহ এবং আটক সৈন্যদের বাংলাদেশ ফেরত পাঠায়। ২১ এপ্রিল দুই পক্ষ অ'স্ত্র সংবরণে সম্মত হয়। এই পরাজয় ভারতীয় বাহিনীর মাঝে এক ধরণের আ'ত'ঙ্ক তৈরি করে।


বিডিআরের পক্ষেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বড়াইবাড়ি এলাকা বাংলাদেশ উদ্ধার করে।


এই যুদ্ধের সময় বিডিআরের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান। 


ফজলুর রহমান আশা করেছিলেন এই অসম সৈনিক নিয়ে যু'দ্ধ জয়ের কারণে শেখ হাসিনা হয়তো তাকে বীর খেতাব দিয়ে পুরস্কৃত করবে। কিন্তু পুরস্কৃত তো দূরের কথা উল্টো তাকে পদ'চ্যু'ত করেছিল।


যু'দ্ধে বিডিআর’র সদস্য নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া, সিপাহী মাহফুজার রহমান ও সিপাহী আব্দুল কাদের শহীদ হন। 


পরবর্তীতে শহীদ ৩ জনের স্মরণে ক্যাম্পের সামনে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্মৃতি ফলক নির্মাণের উদ্বোধন করেন।



গ্রামবাসীর সাহসিকতা

এই যুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ মানুষ যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা অস্ত্রহীন হয়েও দেশপ্রেমের তাড়নায় সীমান্ত রক্ষায় অংশ নেন, যা বড়াইবাড়ির লড়াইকে শুধু সামরিক নয়, গণমানুষের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠ হয়।কয়েকজন সেনাকে গ্রামের জনগণ ধরে গাছের সাথে বেঁ'ধেও রাখে। ভারত যদিও এতো হতা'হতের কথা স্বীকার করে নাই তবে অনেকের ধারনা এই যু'দ্ধে ভারতের প্রায় ৭০জন সৈন্য নি'হত হয়েছিল।


গুরুত্ব ও তাৎপর্য

বড়াইবাড়ি যুদ্ধ বাংলাদেশের সীমান্ত সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে, দেশপ্রেম ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলা করা সম্ভব।


দিবসটি পালনের প্রেক্ষাপট

প্রতিবছর ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ি দিবস হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় জনগণ স্মরণ করে থাকেন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দোয়া, আলোচনা সভা ও নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

বড়াইবাড়ি দিবস শুধু একটি সীমান্ত যুদ্ধের স্মরণ নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।