আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির দিকে ঝুঁকছে ভারত।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো শোকবার্তায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। শোকবার্তায় মোদি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বাস্তবায়িত হবে এবং সেই আদর্শ ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব বিকাশে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। কূটনৈতিক মহলে এটি বিএনপির প্রতি ভারতের আস্থার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র ছিল আওয়ামী লীগ। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির প্রতি ভারতের সমর্থন ছিল দৃশ্যমান। তবে বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় এসব নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায়, রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের কাছে বিকল্প হিসেবে বিএনপিই সামনে এসেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে—এই ধারণা থেকেই ভারতের আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপিই ভারতের ‘নম্বর ওয়ান অপশন’। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরেও সেই সম্পর্ক গড়ার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং জনসমর্থনও ভারতের নজরে এসেছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে রাজধানীতে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তার জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। ভারতের সাবেক কূটনীতিকরাও এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভাজনের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারে এবং মধ্যপন্থী শক্তিগুলোকে সুসংহত করার সুযোগ তৈরি করবে।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, তারেক রহমান এখন ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সঠিক ভাষায়’ কথা বলছেন। ঢাকায় তার প্রত্যাবর্তনে জনসমাগম তার আপাত জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকার সম্ভাবনা দেখায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ঢাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারে তাঁর ভূমিকা এবং তাঁর আদর্শের স্থায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে মোদি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই আদর্শ এগিয়ে নেবে এবং ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব আরও সমৃদ্ধ হবে।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি সতর্ক অবস্থানই নিচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, কূটনীতির মূলনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থ, জনগণ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগোবে। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের মতো ইস্যুতে আপসহীন থাকার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।