
রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ঢাকার ৫০টি থানায় অন্তত ২১৪টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি; কারণ সামাজিক চাপ, হয়রানির আশঙ্কা ও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না।
আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন জিআর অঞ্চলের আওতাধীন থানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মিরপুর, শাহআলী, দারুস সালাম, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, হাজারীবাগ, বিমানবন্দর, কলাবাগান, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট থানায়—মোট ৬১টি। এছাড়া তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, ভাটারা ও আশপাশের থানায় ৪৫টি, উত্তরা ও গুলশান অঞ্চলের থানাগুলোতে ৪৬টি এবং রমনা, শাহবাগ, রূপনগর, পল্লবী ও রামপুরা অঞ্চলে ৩১টি মামলা হয়েছে। খিলগাঁও, মতিঝিল, ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া অঞ্চলের থানাগুলোতে মামলা হয়েছে আরও ৩১টি।
আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের মামলায় আসামি হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এবং গ্রেপ্তার না হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ হতে মাসের পর মাস, কখনও বছরও পেরিয়ে যাচ্ছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না।
এর একটি উদাহরণ কামরাঙ্গীরচর থানার বড়গ্রামের ঘটনা। গত ৩১ জানুয়ারি সাড়ে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিবেশী সজিব হাওলাদারকে হাতেনাতে আটক করেন স্থানীয়রা। শিশুটিকে খেলাধুলার সময় লিপস্টিক দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরিবার মামলা করলেও প্রায় সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামরাঙ্গীরচর থানার এসআই মো. এমরান হোসেন বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দেরি হওয়ায় তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ১৭ জন, যাদের মধ্যে ১২ জনই শিশু। এছাড়া ধর্ষণের পর সামাজিক লজ্জা ও মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে দুই শিশু।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির আশঙ্কা অনেক ভুক্তভোগীকে মামলা করা থেকেও নিরুৎসাহিত করছে। গত মার্চে কোতোয়ালি এলাকায় ধর্ষণচেষ্টার শিকার এক কলেজছাত্রী অভিযোগ না করার কারণ হিসেবে জানান, মামলা করলে দীর্ঘদিন আদালতে ঘুরতে হবে এবং নতুন করে হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় রয়েছে।
উচ্চ আদালতের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে শুধু ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালেই বিচারাধীন ছিল ১৫ হাজার ৪৬৯টি মামলা। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৯১টি। অথচ আইনে ধর্ষণ মামলার বিচার ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা কমছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।