ভারতে হিন্দুদের কাছ থেকে কুরবানির গরু কিনছেন না মুসলিমরা, চরম লোকসানের মুখে হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীরা।

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা | ১৭ মে, ২০২৬
আসন্ন ঈদুল আজহাকে (কোরবানির ঈদ) কেন্দ্র করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে গবাদি পশুর বাজারে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকারি কড়াকড়ি এবং কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর হয়রানির প্রতিবাদ ও আতঙ্কে স্থানীয় মুসলিম ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীরা হিন্দু খামারিদের কাছ থেকে গরু কেনা থেকে বিরত থাকছেন।
এর ফলে বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসার মৌসুমে লাখ লাখ টাকার গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় হিন্দু পশু পালনকারী ও ব্যবসায়ীরা
আইনের কড়াকড়ি ও মুসলিমদের সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে একটি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে "ফিটনেস সার্টিফিকেট" বা উপযুক্ততার শংসাপত্র ছাড়া কোনো গরু বা মহিষ জবাই করা যাবে না। এই শংসাপত্র পেতে হলে পশুর বয়স অন্তত ১৪ বছর হতে হবে অথবা সেটি স্থায়ীভাবে অক্ষম হতে হবে।
কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি এক বিবৃতিতে জানান, "নতুন সরকারি নিয়মের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে কোরবানি দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই হিন্দু ভাইদের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে আমরা মুসলিমদের গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি"। এর বিকল্প হিসেবে ছাগল বা দুম্বা কোরবানির
উগ্রপন্থীদের হয়রানি ও ভয়ের পরিবেশ
মুসলিম ক্রেতাদের অভিযোগ, খোলা বাজার থেকে বৈধভাবে কোরবানি বা ব্যবসার জন্য গরু কিনে বাড়ি ফেরার পথে কট্টরপন্থী 'গোরক্ষক' বাহিনীর চরম হেনস্তা ও আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। বিভিন্ন রাস্তায় অবৈধ চেকপোস্ট বসিয়ে গবাদি পশুর গাড়ি আটকানো, ক্রেতাদের মারধর করা এবং মিথ্যা অভিযোগে পুলিশে সোপর্দ করার মতো ঘটনা ঘটছে। এই আতঙ্কের কারণে সিংহভাগ মুসলিম ক্রেতা এবার বাজারমুখী হচ্ছেন না। অনেক হাটে স্থানীয় মুসলিম যুবকদের বলতে শোনা গেছে, "আপনারা গরুকে মাতা (মা) হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে কেন তা কোরবানির হাটে বিক্রি করতে এনেছেন।
মাথায় হাত হিন্দু খামারিদের
প্রশাসনের এই পদক্ষেপ মুসলিমদের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও এর মূল অর্থনৈতিক ধাক্কা এসে লেগেছে গ্রামীণ হিন্দু খামারিদের ওপর। ভারতে গবাদি পশু লালন-পালনের একটি বড় অংশ পরিচালনা করেন হিন্দু কৃষকেরা। তারা পুরো বছর অর্থ বিনিয়োগ করেন এই ঈদের মৌসুমে ভালো লাভে পশু বিক্রি করার আশায়।
মগরাহাটের এক হিন্দু খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিজেপি সরকার কেন আমাদের মুসলিমদের কাছে গরু বিক্রি করতে দিচ্ছে না? আমি ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কোরবানির জন্য এই পশুগুলো বড় করেছি। মুসলিমরা কখনো আমাদের ক্ষতি করে না। এখন যদি আমরা গরু বিক্রি করতে না পারি, তবে আমাদের পরিবার না খেয়ে মরবে। আমাদের বিষ এনে দেওয়া হোক"।
অন্য এক নারী ব্যবসায়ী বর্তমান সরকারের এই কড়া নীতির সমালোচনা করে বলেন, "মুসলিমরা গরু কেনা বন্ধ করে দেওয়ায় হিন্দু ব্যবসায়ীরা গভীর সংকটে পড়েছে। অবিলম্বে এই নিয়ম প্রত্যাহার করা দরকার, অন্যথায় ডেইরি ও পশুপালনের সাথে যুক্ত হাজার হাজার হিন্দু পরিবার অর্থনৈতিকভাবে
অনলাইনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক পক্ষ মুসলিমদের এই অবস্থানকে 'শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক অর্থনৈতিক প্রতিবাদ' হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে আইনের কড়াকড়ির জবাব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, অনেক সাধারণ নাগরিক মনে করছেন, উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সাধারণ দরিদ্র হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই জীবিকার সংকটে পড়ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও নতুন কোনো বিকল্প ব্যবস্থার ঘোষণা দেওয়া হয়নি, যার ফলে পশুর হাটগুলোতে উত্তেজনা ও হতাশা বেড়েই চলেছে।